প্যারিসের সেই রাত: উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার রক্তাক্ত প্রতিবাদ

  • সাখাওয়াত খান

১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবর। ইউরোপের আলো ঝলমলে রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় তখন প্রবল অন্ধকার। সেই রাতে আলো নিভেছিল শুধু বিদ্যুতের নয়, মানবতারও।
ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়ার স্বাধীনতার দাবিতে শান্তিপূর্ণ মিছিল করতে নামা হাজারো আলজেরিয়ান অভিবাসীর রক্তে ভেসে গিয়েছিল শহরটি।

শান্তিপূর্ণ মিছিল, নিষ্ঠুর দমননীতি

ফ্রান্সের আলজেরিয়া উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ফরাসি সরকার আলজেরিয়ার মুক্তিকামী সংগঠন ফ্রন্ট দে লিবারাসিওঁ নাসিওনাল (এফএলএন)-এর সমর্থনে থাকা অভিবাসীদের ওপর একের পর এক দমননীতি চালাচ্ছিল।
সেই সময় প্যারিসে বসবাসরত প্রায় ২ লাখ আলজেরিয়ানকে বিশেষভাবে নজরদারিতে রাখা হয়। ১৭ অক্টোবরের রাতে তারা রাস্তায় নামেন— শুধুমাত্র “আলজেরিয়ার স্বাধীনতা” ও “সমান অধিকার” দাবি জানাতে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল পতাকা ও স্লোগান।

কিন্তু ফরাসি পুলিশ সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলকে ঘিরে ধরে। এরপর শুরু হয় এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মিছিলকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, অনেককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, আবার অসংখ্য মানুষকে ট্রাকে তুলে নিয়ে সাইন নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

রক্তে রঞ্জিত সাইন নদী

সরকারি হিসাব বলছে, সেদিন নিহত হয় মাত্র ৪০ জন। কিন্তু স্বাধীন গবেষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রায় ৩০০ জন আলজেরিয়ানকে হত্যা করা হয়েছিল।
প্যারিসের সাইন নদীতে তখন ভেসে উঠেছিল রক্তমাখা লাশ— ইউরোপের সভ্যতার মুখোশের নীচে উপনিবেশবাদের নগ্ন নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।

দশকব্যাপী নীরবতা

ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ফ্রান্সে নেমে আসে গভীর নীরবতা। সরকারি নথিপত্র গোপন রাখা হয়, সংবাদপত্রে প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়।
১৯৯০–এর দশক পর্যন্ত কোনো সরকারই এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেনি।
২০০১ সালে প্রথমবারের মতো প্যারিসের এক ছোট ব্রিজের পাশে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়—
“À la mémoire des nombreux Algériens tués lors de la sanglante répression du 17 octobre 1961.”
(“১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবরের রক্তাক্ত দমন অভিযানে নিহত বহু আলজেরিয়ানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।”)

ফ্রান্সের স্বীকৃতি ও ন্যায়ের প্রশ্ন

২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রথম কোনো ফরাসি নেতা হিসেবে ঘটনাটিকে “ফ্রান্সের জন্য অপরাধ” বলে স্বীকার করেন।
কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ বিচার পায়নি।
আলজেরিয়ার ইতিহাসবিদদের মতে, “এই হত্যাকাণ্ড শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং ফ্রান্সের মানবাধিকার–গর্বের ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”

আজকের আহ্বান

৬৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আর্তনাদ আজও থেমে নেই।
উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য আলজেরিয়া ও ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম এখন নতুনভাবে সেই ইতিহাস মনে রাখছে।

প্যারিসের রাস্তায় আজও প্রতিবছর মোমবাতি জ্বলে— সেসব নিঃশব্দ আত্মার স্মরণে, যারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল, আর শহরের হৃদয়ে রক্তাক্ত ইতিহাস এঁকে গিয়েছিল।

(সাখাওয়াত খান, সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল – দক্ষিণ সুদান, এবং জাতিসংঘের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা)

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

কৃষি ভিসায় ইতালি গিয়ে কাজ না পেয়ে যুবকের আত্মহত্যা

নূর নিউজ

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে মালয়েশিয়া

নূর নিউজ

পর্তুগালে জনসমক্ষে নিকাব নিষিদ্ধে বিল পাস, প্রস্তাব সর্বোচ্চ ৪ হাজার ইউরো জরিমানা

আনসারুল হক